খেলোয়াড়দের বাসে ডাকাতের গুলি, প্রাণ হারালেন তারকা ফুটবলার ফ্রিমপং

লেখক: আসিফ ইকবাল
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

মাঠের লড়াই শেষে সতীর্থদের সঙ্গে বাসে চড়ে বিজয়োল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে ঘরে ফেরার কথা ছিল ডমিনিক ফ্রিমপংয়ের। কিন্তু ঘানার একটি নির্জন সড়কের অন্ধকার জঙ্গল থেকে ধেয়ে আসা বুলেট সব হিসাব পাল্টে দিল। ঘানা প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম শক্তিশালী দল বেরেকুম চেলসির খেলোয়াড়বাহী বাসে একদল সশস্ত্র ডাকাতের অতর্কিত হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন দলটির ২০ বছর বয়সী উদীয়মান উইঙ্গার ডমিনিক ফ্রিমপং। এই পৈশাচিক ঘটনা কেবল ঘানা নয়, বরং পুরো বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনকেই এক গভীর বিষাদে ডুবিয়ে দিয়েছে। খেলার মাঠের বীরদের এভাবে সড়কের নির্দয়তায় প্রাণ হারানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

বিগত রবিবার রাতে ঘানার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সামরেবোইয়েতে সামারটেক্সের বিপক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলে বেরেকুমের দিকে ফিরছিল চেলসি দলটি। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি আর মাঠের লড়াইয়ের উত্তেজনা নিয়ে খেলোয়াড় ও স্টাফরা বাসের ভেতরে ছিলেন। গাড়িটি যখন গোয়াসো-বিবিয়ানি সড়ক দিয়ে যাচ্ছিল, তখন হঠাৎ একদল মুখোশধারী ডাকাত রাস্তা আটকে বাসের গতিরোধ করার চেষ্টা করে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে বাসের অভিজ্ঞ চালক দ্রুত গাড়িটি পেছানোর চেষ্টা করেন যাতে কোনোভাবে সেই বিপদ থেকে সরে আসা যায়। কিন্তু সেই প্রচেষ্টাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। গাড়ি ঘোরানোর মুহূর্তেই ঝোপের আড়াল থেকে সন্ত্রাসীরা একে-৪৭ এবং বিভিন্ন আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বাস লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে।

আতঙ্কে বাসের ভেতরে থাকা খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন। ভাঙা কাঁচ আর বুলেটের শিস কাটানোর শব্দে চারদিকে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জীবন বাঁচাতে অনেক খেলোয়াড় বাস থেকে লাফিয়ে নেমে পাশের ঘন ঝোপঝাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ডমিনিক ফ্রিমপং ঘাতকদের নিক্ষিপ্ত সেই বুলেটের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেননি। তরুণ এই ফুটবলারের শরীরে গুলি লাগলে তিনি ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন। মাত্র ২০ বছর বয়সের এক তরতাজা প্রাণ নিভে যায় স্রেফ কিছু ডাকাতের লুটতরাজের নেশার বলি হয়ে।

ডমিনিক ফ্রিমপং ছিলেন ঘানা ফুটবলের এক প্রতিশ্রুতিশীল নক্ষত্র। বেরেকুম চেলসির উইং ধরে তার ক্ষিপ্র গতির দৌড় আর চমৎকার ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য ছিল ত্রাস। লিগের প্রতিটি ম্যাচেই তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে আসছিলেন। ঘানা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (জিএফএ) তাদের আনুষ্ঠানিক শোকবার্তায় ডমিনিককে এক ‘উজ্জ্বল তরুণ প্রতিভা’ হিসেবে অভিহিত করেছে যার ফুটবলের প্রতি ছিল অগাধ ভালোবাসা। যে সময়ে ডমিনিকের জাতীয় দলের হয়ে মাঠ মাতানোর স্বপ্ন দেখার কথা ছিল, সেই সময়ে তাকে সাদা কাফনে মোড়ানো অবস্থায় বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। এই অকাল মৃত্যু কেবল একটি ক্লাবের ক্ষতি নয়, বরং একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্না এবং একটি জাতির ক্রীড়া সম্ভাবনার অপমৃত্যু।

এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি ঘানা ফুটবলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এটিই প্রথম নয় যে ঘানাতে কোনো ফুটবল দল বা খেলোয়াড় এভাবে আক্রান্ত হলেন। ঠিক গত বছরই প্রায় একই এলাকায় অন্য একটি ক্লাবের বাসে হামলা হয়েছিল, তবে সেবার ভাগ্যক্রমে কেউ হতাহত হননি। প্রশাসনের সেই সময়কার ঢিলেঢালা ভাব আর উদাসীনতাই আজ ডমিনিকের মতো এক প্রতিভাকে কেড়ে নিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফুটবলাররা যখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে যান, তখন তাদের যথাযথ নিরাপত্তা প্রদান না করাটা বড় ধরণের অবহেলা। জিএফএ এখন ক্লাবগুলোর যাতায়াতের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যে—কেন একটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার পর আমাদের টনক নড়ে?

সোমবার সকালে বেরেকুম চেলসির পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে ঘটনার যে নারকীয় বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা শুনে পুরো ক্রীড়া বিশ্ব স্তম্ভিত। বাসে থাকা সতীর্থরা তাদের চোখের সামনে প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে এখন চরম ট্রমার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মাঠের ভেতরে ড্রিবলিং করে গোল দেওয়া শেখা এই তরুণদের রাজপথের এমন বীভৎস বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। পুরো ঘানা জুড়ে এখন শোকের ছায়া বিরাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফুটবল প্রেমীরা তাদের ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন এবং এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন।

পরিশেষে বলা যায়, ডমিনিক ফ্রিমপংয়ের এই হত্যাকাণ্ড ঘানার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এক কঠিন বার্তা। যদি অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা না হয়, তবে দেশটির ক্রীড়াঙ্গন এক অস্থিরতার মধ্যে পড়বে এবং খেলোয়াড়রা মাঠে যেতে ভয় পাবেন। ফুটবল আনন্দের ভাষা, আর সেই আনন্দের দূতদের ওপর এমন হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা আশা করি ডমিনিকের এই আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। ঘানা সরকার এবং ফুটবল কর্তৃপক্ষ কেবল শোকপ্রকাশে সীমাবদ্ধ না থেকে খেলোয়াড়দের জন্য একটি নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। ডমিনিক ফ্রিমপং হয়তো আর কখনো সবুজ ঘাসে বল নিয়ে দৌড়াবেন না, কিন্তু তার সতীর্থ আর ভক্তদের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন এক অমলিন স্মৃতি হয়ে। এই শোক কাটিয়ে ফুটবল আবার স্বমহিমায় ফিরুক, আর কোনো ডমিনিককে যেন এভাবে অকালে ঝরে যেতে না হয়।