২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে গত দুই মাসে সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যেমন দ্রুততা দেখিয়েছে, তেমনি কিছু অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিশেষ মনোযোগী হয়েছেন। গত ১০ মার্চ থেকে দেশজুড়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্য পাচ্ছে। এছাড়া ১৪ মার্চ থেকে ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য সরকারি মাসিক সম্মানী এবং ১৬ মার্চ থেকে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। একইসাথে ১২৯ জন কৃতি ক্রীড়াবিদকে বিশেষ ‘ক্রীড়া কার্ড’ প্রদান করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রশাসনে এক নতুন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যানজট নিরসনে নিজের গাড়িবহর ছোট করা, সরকারি গাড়ির পরিবর্তে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার এবং সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কড়াকড়ি আরোপ সর্বমহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। এছাড়া সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার অফিস করার সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা এনেছে। বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে যখন ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ঘনীভূত। এই সংকট সত্ত্বেও দেশে তেলের দাম না বাড়ানোকে সরকারের বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারকরা। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার মধ্যেও তেলের দাম স্বাভাবিক রাখা এবং রমজানে কৃত্রিম সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখা সরকারের অভূতপূর্ব সাফল্য।
সাফল্যের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে সরকারকে কড়া সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে শুরু হওয়া ‘মব সন্ত্রাস’ বা গণপিটুনি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যমতে, গত কয়েক মাসে মব ভায়োলেন্সে বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, যা সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ সরকারের ভাবমূর্তিকে কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। যদিও সরকার ও দল এ বিষয়ে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছে এবং অভিযুক্তদের বহিষ্কার করা হচ্ছে, তবুও স্থানীয় পর্যায়ের বিশৃঙ্খলা পুরোপুরি থামেনি।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করা এবং সড়কের চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের পরিবর্তে দায়িত্বশীলদের ‘অতিরিক্ত বক্তব্য’ নিয়ে জনমনে কিছুটা অসন্তোষ দেখা গেছে। বিএনপি সরকারের প্রথম দুই মাস ছিল মূলত দীর্ঘ বিরতির পর রাষ্ট্রযন্ত্রকে নতুন করে সাজানোর সময়। এই অল্প সময়ে কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে যে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং মব ভায়োলেন্স রুখতে না পারলে সরকারের এই অর্জনগুলো ম্লান হয়ে যেতে পারে। প্রতিশ্রুতি পূরণ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই হবে আগামী দিনগুলোতে তারেক রহমান সরকারের প্রধান পরীক্ষা।
