হত্যাকাণ্ড মামলা: ফের রিমান্ডে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাঞ্জিল হায়দার

লেখক: আসিফ ইকবাল
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে
সেনা কর্মকর্তা মাঞ্জিল হায়দার

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়েছে বরখাস্ত হওয়া সেনা কর্মকর্তা মাঞ্জিল হায়দারের পুনরায় রিমান্ড। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত জুলাই ও আগস্ট মাসে সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর যে নির্বিচার গুলি এবং দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল, সেই ঘটনার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে একের পর এক প্রভাবশালী ব্যক্তি আইনের আওতায় আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় মাঞ্জিল হায়দারকে ফের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, যা এই বিচার প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের মতো স্পর্শকাতর মামলায় একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা এবং তাকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে থাকা অনেক গভীর রহস্য এবং পরিকল্পনার জট খোলার চেষ্টা করছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

জুলাই মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যখন রাজপথে সাধারণ মানুষের রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। মাঞ্জিল হায়দারের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে, তিনি সেই সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে হত্যাকাণ্ডে প্ররোচনা দিয়েছিলেন অথবা সরাসরি কোনো অপারেশনাল প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন যা সাধারণ মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম দফার রিমান্ডে তার কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেলেও তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, ঘটনার গভীরতা এবং পরিকল্পনার মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে তাকে আরও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। আদালত সবকিছু বিবেচনা করে তদন্তের স্বার্থে তাকে আবারও রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, জুলাইয়ের সেই অভ্যুত্থান দমনে কেবল রাজপথে থাকা পুলিশ বা বিজিবি নয়, বরং নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থার কতিপয় উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তার গোপন আঁতাত ছিল। মাঞ্জিল হায়দারের মতো ব্যক্তিদের রিমান্ডে নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো সেই কমান্ড চেইন বা নির্দেশের উৎস খুঁজে বের করা। কার নির্দেশে নিরস্ত্র মানুষের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেই সময়কার বিশেষ সেলগুলো কীভাবে কাজ করছিল, তা বের করা এখন সময়ের দাবি। প্রথম রিমান্ডে মাঞ্জিল হায়দার অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন বলে জানা গেছে, যে কারণে দ্বিতীয় দফায় তাকে মুখোমুখি করা হচ্ছে আগের সংগ্রহ করা তথ্যের সাথে। এই জিজ্ঞাসাবাদ থেকে প্রাপ্ত তথ্য কেবল মাঞ্জিল হায়দারের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং সেই সময়কার আরও অনেক নেপথ্য কুশীলবকে আইনের আওতায় আনতে সহায়তা করবে।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে সারা দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা বিরাজ করছে। হাজারো পরিবারের সন্তান হারানোর বেদনা এবং পঙ্গুত্ব বরণ করা মানুষের আর্তনাদ আজ বিচারের দাবিতে রাজপথে এবং আদালতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এমন একটি সময়ে একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার রিমান্ডে যাওয়ার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মনে ন্যায়বিচারের আশা জাগিয়ে তুলেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমরা দেখেছি যে, প্রভাবশালী বা উর্দিধারী ব্যক্তিদের অপরাধের বিচার হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইনের ঊর্ধ্বে যে কেউ নয়, সেই বার্তাই এই মামলার কার্যক্রমের মাধ্যমে স্পষ্ট হচ্ছে। মাঞ্জিল হায়দারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো যদি সঠিক প্রমাণিত হয়, তবে তা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে।

রিমান্ডের এই পর্যায়ে তদন্ত সংস্থাগুলো বিশেষ নজর দিচ্ছে ডিজিটাল এভিডেন্স এবং কল রেকর্ডলিস্টের ওপর। সেই দিনগুলোতে মাঞ্জিল হায়দার কাদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, কোন কোন এলাকা থেকে সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছিলেন এবং সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সাথে তার গোপন কোনো বৈঠক হয়েছিল কি না—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রকাশ্যে নির্দোষ সাজলেও নেপথ্যে থেকে অনেকেই দমন-পীড়নের ছক এঁকেছিলেন। জুলাইয়ের আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা একক কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না বরং একটি পরিকল্পিত গণহত্যার নীল নকশা ছিল বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। মাঞ্জিল হায়দারকে রিমান্ডে নেওয়ার মাধ্যমে সেই নীল নকশার প্রতিটি ধাপ উন্মোচনের চেষ্টা চলছে।

এদিকে মাঞ্জিল হায়দারের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেছেন যে, তাকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে এবং তিনি কেবল তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো দায়িত্বই নিরস্ত্র মানুষের বুকে গুলি চালানোর অধিকার দেয় না। আন্তর্জাতিক আইন এবং বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, অবৈধ আদেশ পালন করাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। জুলাই মাসের সেই দিনগুলোতে যখন হাসপাতালের মর্গে লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছিল, তখন যারা সেই ব্যবস্থার অংশ ছিলেন, তারা কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না। বিশেষ করে মাঞ্জিল হায়দারের মতো কর্মকর্তাদের ভূমিকা সাধারণ মানুষের কাছে ছিল ত্রাসের কারণ। তাই তাকে রিমান্ডে নিয়ে তথ্য আদায়ের প্রক্রিয়াটি ন্যায়বিচারের স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি মামলার তদন্ত অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে হওয়া প্রয়োজন। কারণ এখানে কেবল একজন ব্যক্তির অপরাধ নয়, বরং পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার জড়িয়ে আছে। মাঞ্জিল হায়দারকে রিমান্ডে নেওয়ার ফলে অনেক গোপন তথ্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে যা ভবিষ্যতে এই ধরণের অপরাধ রোধে ঢাল হিসেবে কাজ করবে। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যারা সাধারণ মানুষের টুঁটি চেপে ধরতে চেয়েছিল, তাদের পরিণতি কী হতে পারে—মাঞ্জিল হায়দারের বর্তমান অবস্থা তারই একটি প্রতিচ্ছবি। এই মামলাটি কেবল একটি খুনের মামলা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ঘুরে দাঁড়ানোর এবং সত্য উদ্ঘাটনের লড়াই।

পরিশেষে বলা যায়, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মাঞ্জিল হায়দারের মতো ব্যক্তিদের রিমান্ড এবং জিজ্ঞাসাবাদ সেই চ্যালেঞ্জ জয়ের পথে প্রাথমিক ধাপ। বিচারহীনতার যে অন্ধকার গত দেড় দশকে সমাজকে গ্রাস করেছিল, তা দূর করতে হলে প্রতিটি অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই দিনের জন্য, যখন প্রতিটি বুলেটের হিসাব নেওয়া হবে এবং যারা সেই ধ্বংসযজ্ঞের কারিগর ছিল, তারা আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবে। মাঞ্জিল হায়দারের রিমান্ড কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি শহীদদের রক্তের প্রতি রাষ্ট্রের এক ধরণের দায়বদ্ধতা। এই তদন্ত যেন কোনোভাবেই প্রভাবিত না হয় এবং প্রকৃত অপরাধীরা যেন কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হলে এই বিচার প্রক্রিয়াকে যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছাতেই হবে।